যে কৌশলে সুন্দরী তরুণীদের ফাঁদে ফেলতেন ‘ভণ্ডপীর’ হাবিব পিয়ার

জিন-ভূত তাড়ানোর নামে সুন্দরী তরুণীদের কূটকৌশলে বাসায় নিয়ে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতেন ‘ভণ্ডপীর’ আহসান হাবিব পিয়ার। ইংরেজি ও আরবি ভাষায় পারদর্শী হাবিব তরুণীদের কাছে ছিল আকর্ষণীয় পুরুষ। কথার জাদুতে মুহূর্তেই তরুণীদের আকৃষ্ট করার অসম্ভব ক্ষমতা তার। নানা সমস্যা নিয়ে ছুটে আসা উঠতি বয়সী মেয়েদের কথার জাদুর ফাঁদে ফেলে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতেন তিনি। গোপনে সে দৃশ্য ভিডিও করতেন। পরে ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে আদায় করতেন মোটা অংকের টাকা। মামলার তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ইসলাম প্রচারের নামে সাহায্য হিসেবে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশের মাধ্যমেও অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। দুই দিনের রিমান্ডে গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য দিতে শুরু করেছে পিয়ার। তার গ্রেপ্তারের পর বেশ কয়েকজন প্রতারিত নারী তথ্য দিতে গোয়েন্দা কার্যালয়ে আসেন, এমনকি ফোনেও তথ্য দিচ্ছেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সুত্র। প্রতারণার শিকার রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক ছাত্রী বলেছেন, আহসান হাবিবের ইউটিউবে এইচপি নামে একটি চ্যানেল রয়েছে। ওই চ্যানেলে মাঝেমধ্যেই ছদ্মনামে হাজির হতেন তিনি। কথার জাদুতে আকৃষ্ট হয়ে ওই তরুণী তার খপ্পরে পড়েন। এক পর্যায়ে হাবিব ওই তরুণীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সে দৃশ্য ভিডিও করে পরবর্তীতে তরুণীর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রায় ৬ মাস আগে ওই ঘটনায় অভিযোগ দায়েরের পর কাউন্টার টেরোরিজমের সাইবার ক্রাইম ইউনিট মঙ্গলবার গভীর রাতে হাবিবকে গ্রেফতার করে। এদিকে ভিডিও ধারণ করে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার ‘ভণ্ডপীর’কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় ‘ভণ্ডপীর’কে বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর হাকিম মাঈন উদ্দিন সিদ্দিকীর আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. নাজমুল ইসলাম জানান, খিলগাঁও থেকে গ্রেফতারের পর ভণ্ডপীরের কম্পিউটার থেকে এ ধরনের ২০টি ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেক বই উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব অ্যাকাউন্টে কয়েক লাখ টাকা জমা রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম বলেছেন, এই ভণ্ডপীর দাওরায়ে হাদিসের শিক্ষার্থী। ইউটিউবে তার নিজের চ্যানেলের মাধ্যমেই তিনি প্রতারণা করে আসছিলেন। সেখানে ধর্মের কথা বলে অল্প দিনেই বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে যান তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ধর্মের কথা বলে অনেক অনুসারী তৈরি করেছে এই প্রতারক। নিজেকে পীর দাবি করে জিন তাড়ানোসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেয়ার কথা বলে মেয়েদের বশে আনতেন তিনি। মেয়েদের সঙ্গে ইমো ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নানা কায়দায় তরুণীদের বাসায় এনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতেন এ প্রতারক। নাজমুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে এর সত্যতা পাওয়া যায়। তদন্ত কর্মকর্তা সাত দিনের রিমান্ড চাইলে শুনানি শেষে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম মাঈন উদ্দিন সিদ্দিকী দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দ্বায়িত্বশীল একটি সুত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে পিয়ার গত এক বছরে জ্বিন ভূত তাড়ানোর নাম করে ও প্রেমের ফাঁদে ফেলে অসংখ্য নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেছেন বলে স্বীকার করেছেন । ওই কর্মকর্তারা জানান, উত্তরায় ঘণ্টা চুক্তিতে রুম ভাড়া নিয়ে সে নারীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেছে ও কৌশলে ভিডিও ধারণ করেছে। ভিডিওগুলো পরবর্তীতে তার কম্পিউটার ও মোবাইলে রাখে। গ্রেপ্তারের সময় কিছু ভিডিও উদ্ধার হলেও জিজ্ঞাসাবাদের পর সে আরো ভিডিও ধারণের তথ্য দেয়। পরবর্তীতে ভিডিওগুলো গোয়েন্দাদের দেয়। গোয়েন্দাদের এক প্রশ্নে পিয়ার জানায়, বাসার পাশাপাশি উত্তরায় ঘণ্টা চুক্তিতে রুম ভাড়া নিয়ে সে এ কাজ করেছে। ভিডিও ধারণ করা নারীদের বয়স সবার ৩০ এর নিচে। এদিকে, জিজ্ঞাসাবাদে পিয়ার তার ইসলামী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তথ্য দেয়। গোয়েন্দারা তার অ্যাকাউন্টে গত কয়েকমাসে ২০ লাখ টাকার লেনদেন দেখতে পান। তার অ্যাকাউন্টে আসা টাকা দেশের বিভিন্ন এলাকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো থেকে আসা। ইসলাম প্রচারের নামে প্রবাসী ও মধ্যপ্রাচ্যের নাগরিকরা তার অ্যাকাউন্টে টাকাগুলো পাঠিয়েছে। এছাড়াও বিকাশের মাধ্যমেও প্রবাসী ও দেশের লোকদের কাছ থেকে সে টাকা নিয়েছে। মূলত ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও ছেড়ে লোকজনের সহানুভূতি অর্জন করে সে। আর এভাবেই টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিকাশ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সব মিলিয়ে ৩০ লাখের বেশি টাকা লেনদেন করেছে গত কয়েকমাসে। গোয়েন্দারা বলেন, তার আরো কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না, জানার চেষ্টা চলছে। নাটোরের এক প্রতারিত তরুণী তদন্তকারী টিমকে জানান, তিনি সৌদি আরবে থাকার সময় ফেসবুকের মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিচয়। ফেসবুকে চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে সে প্রেমের অফার দেয়। ইসলাম ও নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে তার কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা নেয়। তিনি বলেন, বুধবার তার গ্রেপ্তারের খবর শোনার পর তিনি গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, সে আসলেই একজন ভণ্ড। ইসলামের লেবাসে তার মতো অসংখ্য নারীর সঙ্গে সে প্রতারণা করেছে। তার শাস্তিও দাবি করেন তিনি। প্রতারিত আরেক নারী জানান, ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হওয়ার পর সে ইসলাম প্রচারের কথা বলে। নিজেকে অসহায় উল্লেখ করে তার কাছ থেকেও টাকা চায়। তিনি ৪ মাসে তাকে ৪ লাখ টাকা দিয়েছেন। তিনিও পিয়ারের শাস্তি দাবি করেন। ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলেন, তার কাছ থেকে প্রতারণার সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। নিজেকে ইসলামের লেবাসে এভাবে প্রতারণার ঘটনা বিরল বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর আগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আহসান হাবিব পিয়ার দাওরায়ে হাদিসে পড়াশোনা করেছে। নিজেকে এএইচপি টিভির সাংবাদিক বলে পরিচয় দিয়ে এবং নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ধর্মের কথা বলে সাধারণ মানুষকে আস্থায় আনার চেষ্টা করত। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সম্প্রতি নিজেকে পীর দাবি করে আহসান হাবিব পিয়ার। এ পরিচয়ে জিন তাড়ানোর কথা বলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। ডিএমপি জানায়, বিভিন্ন সময় মেয়েদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন উত্তেজক কথা বলে এবং পরে এদের অনেককে নিজ বাসায় এনে ব্ল্যাকমেইল করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করত পিয়ার। আরও জানা যায়, পীর দাবি করা ভণ্ড হুজুর মেয়েদের সঙ্গে যৌনকর্ম করার সময় ভিডিও করে তা কম্পিউটারে সংরক্ষণ করত। পরে সুযোগ মতো ভিডিওর কথা বলে ব্ল্যাকমেইল করে লাখ লাখ টাকা আদায় করত। এ ব্যাপারে অভিযোগ পাওয়ার পর সিটিটিসি ঘটনাটি তদন্ত শেষে মঙ্গলবার রাতে আহসান হাবিব পিয়ারকে গ্রেফতার করে। আহসান হাবিব পিয়ারের বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *