ম্যারাডোনা সর্বকালের সেরা, মেসির পেছনে পেলে

সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে? বিংশ শতাব্দীতে এই প্রশ্নের উত্তরে দিয়েগো ম্যারাডোনা এবং পেলের নামই সর্বাধিক উচ্চারিত হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে তাদের সঙ্গে জায়গা করে নেয় লিওনেল মেসির নাম। অনেকেই এখনই মেসিকে সর্বকালের সেরার খেতাব দেয়া শুরু করেছেন। তবে পেলে কিংবা মেসি নন; বিশ্বের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ম্যারাডোনাকেই বেছে নিল ফুটবল সাময়িকী ফোর ফোর টু। জাতীয় দল এবং ক্লাবের হয়ে ম্যারাডোনার চেয়ে পেলে অনেক বেশি গোল করেছেন। আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ১৯৮৬ সালে দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। তবে পেলে বিশ্বকাপের শিরোপায় চুমু আঁকেন তিন তিনবার। জাতীয় দলের হয়ে মেজর কোনো শিরোপা জিতলে না পারলেও এই বয়সে ক্লাবের হয়ে মেসি যা জিতেছেন সেটিও তাকের সেরাদের কাতারে রাখে। তবে ফোর ফোর টু’র দৃষ্টিতে ম্যারাডোনাই সর্বকালের সেরা। মজার ব্যাপার হলো- শীর্ষ তো জায়গা পানইনি পেলে, দ্বিতীয় স্থানেও তার জায়গা মেলেনি। ফোর ফোর টু ম্যারাডোনার পরই বেছে নেয় মেসিকে। এরপর তিন নম্বরেই রয়েছেন কালো মানিক। শীর্ষ পাঁচে থাকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে চারে রয়েছেন ইয়োহান ক্রুইফ। ব্রাজিলিয়ান তারকা রোনালদো দ্য ফেনোমেনন রয়েছেন ঠিক দশ নম্বরে। আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর অবস্থান ছয়ে। ফ্রেঞ্জ বেকেনবাওয়ার সাত নম্বরে এবং একধাপ পিছিয়ে আট নম্বরে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের কোচ জিনেদিন জিদান। নয় নম্বরে অবস্থান ফেরেঙ্ক পুসকাসের।
কোকেইন নেয়ার অপরাধে ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন ম্যারাডোনা। কোচদের সঙ্গেও লেগে থাকত দ্বন্দ্ব। খেলা ছাড়ার পরও বিতর্ক ছিল তার নিত্য সঙ্গী। তারপরও ম্যারাডোনাকে সেরা হিসেবে বেছে নেয়ায় প্রশ্ন উঠতেই পারে। এর জবাবে ফোর ফোর টু জানায়, ফুটবল পায়ে যদি আপনি ম্যারাডোনাকে দেখে থাকেন তবে ব্যাপারটি বুঝতে পারবেন।
অবশ্য ফুটবল পায়ে ম্যারাডোনা যেটি করে দেখিয়েছেন সেটির তুলনা হয় না। বিশ্বের করে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে বলতে গেলে তার নৈপুণ্যেই শিরোপার স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। দেশকে শিরোপা জেতানোর পথে শতাব্দীর সেরা গোলটিও করেন ফুটবল-ঈশ্বর।
শিল্প, নান্দনিকতা এবং সৌন্দর্য- মেসির খেলায় তিনটিই খুঁজে পাওয়া যায়। বল নিয়ে হঠাৎ দৌড়, দৃষ্টিনন্দন ফ্রি-কিক, ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস এবং দর্শনীয় গোল করে ফুটবলবিশ্বকে মোহিত করে রেখেছেন মেসি। ২০১৪ বিশ্বকাপে অল্পের জন্য আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতাতে পারেননি। তারপরও তার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না।
১৯৫০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ঘরের মাঠ মারাকানায় উরুগুয়ের বিপক্ষে জিততে জিততে হেরে গিয়েছিল ব্রাজিল। তখন পেলের বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর; পরিবারের দেয়া ডাকনাম ছিল এডসন আর্নান্তেস দো  নাসিমেন্তো। ফাইনালে ব্রাজিল হেরে যাওয়ার পর খুব কাছ থেকেই বাবাকে কাঁদতে দেখেছিলেন কালো মানিক। ‘ফা*** ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে গেছে’ খেদোক্তি প্রকাশ পায় পেলের মুখ দিয়ে।
ব্রাজিলিয়ানদের কাছে এডসন এবং পেলে দুজন ভিন্ন মানুষ। ছোটবেলায় ক্লাসের এক সহপাঠী হাস্যরসের ছলে তাকে পেলে নাম দেয়। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির কাছে সেই নামটি শিশুসূলভ মনে হওয়ায় সহপাঠীর নাক ফাটিয়ে দিয়ে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হন। নিষেধাজ্ঞা শেষে স্কুলে ফিরলে আর তিনি এডসন থাকেননি; পেলে হিসেবেই পরিচিত পান। সেই থেকেই যেন ভাগ্য বদলে যায় ব্রাজিলের।
সেই যে ছোটবেলায় বাবার চোখের জল দেখেছিলেন সেই জল দেখেছিলেন তার দায় মেটানোর তাড়া ছিল পেলের। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নেমে ইতিহাস গড়েন কালো মানিক। বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় বিশ্বরেকর্ড গড়েন তিনি। সুইডেনে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক করার পর ফাইনালে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাইয়ে দেন পেলে। যেন বাবার চোখে দেখা জলের উত্তর দিলেন পেলে। এরপর ১৯৬২ এবং ১৯৭০ সালেও ব্রাজিলের হয়ে শিরোপা জেতেন ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *