বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক মুদ্রানীতি ঘোষণা

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মাথায় রেখে ঋণ সরবরাহে সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর প্রাক্কলন কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য যথেষ্ট বলে মনে করছে আর্থিক খাতের এ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আর মুদ্রানীতির লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রের বর্তমান সুদহারকে অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করে তা কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এক কথায় এই মুদ্রানীতিকে স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমূলক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ফজলে কবির চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা আল্লাহ মালিক কাজেমী, ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান ও এস কে সুর চৌধুরী, প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ফয়সাল আহমেদ, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. আখতারুজ্জামানসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গভর্নর বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি পরিমিত রাখার পাশাপাশি দেশজ উৎপাদনে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। বেসরকারি খাতে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ ঋণ জোগানের প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। আর সরকারি খাতে ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ। নতুন অর্থবছরের জন্য গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে পরিমিত রাখা এবং ৭ দশমিক ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণের এ প্রাক্কলন যথেষ্ট।’ তিনি বলেন, ‘আকস্মিক বন্যায় ফসলহানির ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকায় অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি পরিমিত রাখা যাবে। আবার রফতানি প্রবৃদ্ধির মন্থরতা এবং রেমিট্যান্স কমার ফলে তারল্য জোগান পরিমিত রয়েছে। যে কারণে রেপো, রিভার্স রেপোসহ নীতি সুদহার আপাতত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করা হবে। আগের মুদ্রানীতিতে গত জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছিল। এবারের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর নাগাদ ১৬ দশমিক ২ এবং জুন নাগাদ ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে। আগের প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় এবারের প্রাক্কলন কম হলেও তা প্রকৃত অর্জনের তুলনায় বেশি। গত মে পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ শতাংশ। এ বিষয়ে গভর্নর বলেন, ‘প্রতিবছর আর্থিক খাত বড় হচ্ছে। ব্যাংক ব্যবস্থার অনেক বড় ঋণের ওপর ভিত্তি করে নতুন প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। ফলে নতুন প্রাক্কলনকে আগের তুলনায় কম বলা যাবে না। কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য এটাই যথেষ্ট।’ সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারভিত্তিক না হওয়াকে মুদ্রানীতির প্রধান ঝুঁকি উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারের সঙ্গে সঙ্গতিহীন। সরকারের সুদ ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াও বন্ডবাজারের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার বর্তমান মাত্রায় থাকলে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে এও ঠিক, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এ ধরনের কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। এখন প্রকৃত ব্যক্তিরা যেন এর সুবিধা পায় সরকার সেদিকে জোর দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমানতের সুদহার এখন অনেক কমে এসেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বজায় রাখা হয়েছে।’ ফজলে কবির বলেন, ‘ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানো ও নগদ অর্থ আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম রোধে বিভিন্ন ধরনের পদেক্ষপ চলমান রয়েছে। আর পুনর্গঠিত বড় ঋণ নতুন করে খেলাপি হওয়ায় আবার সুবিধা দেওয়া হবে কি-না এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত কিছু ভাবছে না।’ খেলাপি ঋণ বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে এস কে সুর চৌধুরী বলেন, ‘ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনার পর থেকে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে এটা ঠিক, নানা সুবিধার পরও খেলাপি ঋণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামানো যায়নি।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।’ রেমিট্যান্স: গভর্নর বলেন, ‘মুদ্রানীতির দুই চ্যালেঞ্জের একটি রেমিট্যান্স কমে যাওয়া।’ তিনি বলেন, ‘শুধু দেশের বাইরে শ্রমিক রফতানি কমার কারণে রেমিট্যান্স কমছে তা নয়; মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ ব্যাংকগুলোর ওপর মাত্রাতিরিক্ত কঠোর মানি লন্ডারিং আইন প্রয়োগের কারণে এমনটি হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে বড় বড় আন্তর্জাতিক ব্যাংক বিপুল অঙ্কের অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পর রেমিট্যান্স প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে বৈধ পথে অর্থ প্রেরণ দুরূহ হয়ে পড়েছে। বিষয়টি সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে কথা বলছে।’ এক প্রশ্নের উত্তরে আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা কিছু অনিয়ম করেছে। মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে কোথায় কীভাবে অর্থ গেছে এ ধরনের কিছু তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে আছে। এসব বিষয় নিয়ে এখন কাজ চলছে। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বড় ব্যাংক বাংলাদেশের ৯টি ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আরও কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে আংশিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে। অতি সতর্কতার ফলে খুব ছোট বিষয় নিয়ে সম্পর্ক ছিন্নের ঘটনা ঘটছে। এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এপিজি, এফএটিএফসহ বিভিন্ন ফোরামে কথা বলছে। আবার আন্তর্জাতিক যেসব ব্যাংক এখানে কাজ করছে, তারা এখানকার কোনো ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে অন্তত বাংলাদেশ ব্যাংককে যেন অবহিত করে, সে বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *